রবিবার, ২ জানুয়ারি, ২০১১

স্বাধীনতা উত্তর বাঙলাদেশে মেহনতী জনগণের শ্রেণীসংবিধান সমাজতান্ত্রিক সংবিধান

 ১। সংবিধান রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মূলনীতি। তবে সংবিধান প্রধানতঃ রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থার মূল কাঠামো। সংবিধান দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পুনর্গঠনের জাতীয় নীতিমালা। শ্রেণীবিভক্ত সমাজে সংবিধান অবধারিতভাবে শ্রেণীসংবিধান। সংবিধান মূলতঃ শ্রেণীসমূহের শ্রেণীসংগ্রামের কর্মসূচী। রাষ্ট্র, সরকার ও সংসদের আইনী ভিত্তি সংবিধান।

মার্কসবাদ-লেনিনবাদের শিক্ষা স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শ্রমিক কৃষক জনগণের সংবিধান বিপ্লবী গণতান্ত্রিক সংবিধান। পরাধীন দেশে (উপনিবেশিক দেশ) শ্রমিক কৃষক নিম্ন মধ্যবিত্ত জনগণের সংবিধান জাতীয় গণ্তান্ত্রিক সংবিধান। স্বাধীন বুর্জোয়া রাষ্ট্রে শ্রমিকশ্রেণীর মেহনতী জনগণের (শিল্প শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক ও সকল শ্রমজীবি জনগণ) সংবিধান সমাজতান্ত্রিক সংবিধান।

দুঃখজনক হলেও সত্য বাঙলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনে দীর্ঘদিন যাবত তাৎপর্যপূর্ণ তত্ত্বগত সমস্যা বিদ্যমান। বাঙলাদেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ মূল্যায়ন এখনও চূড়ান নয়। বিশেষতঃ বাঙলাদেশের সমাজের বিপ্লবের স্তর বা শ্রেণীচরিত্র নির্ধারণ এখনও প্রধানতঃ বিতর্কমূলক। অপর কথায় বাঙলাদেশের শ্রমিকশ্রেণীর মেহনতী জনগণের সংবিধান গণতান্ত্রিক নাকি সমাজতান্ত্রিক এই গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বগত প্রশ্নটি এখনও প্রধানতঃ অমীমাংসিত।

তবে তত্ত্বগত অনুশীলনের প্রেক্ষাপটে আমাদের সুচিন্তিত অভিমত বাঙলাদেশ (১৯৭১-২০১০) রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন বুর্জোয়া রাষ্ট্র। বাঙলাদেশের উৎপাদন ব্যবস্থা পুঁজিবাদী। বাঙলাদেশের শাসকশ্রেণী বুর্জোয়াশ্রেণী এবং সরকার বুর্জোয়া সরকার। বাঙলাদেশের সমাজের বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক পরিবর্তন প্রধানতঃ পরিসমাপ্ত।

তত্ত্বগত বিচারে স্বাধীনতা উত্তর বাঙলাদেশে সমাজের বিপ্লবের স্তর বা শ্রেণীচরিত্র সমাজতান্ত্রিক। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে বুর্জোয়া সংবিধানের গুণগত বিপরীতে শ্রমিকশ্রেণীর মেহনতী জনগণের শ্রেণীসংবিধান সমাজতান্ত্রিক সংবিধান। স্বাধীনতা উত্তর ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকা এবং রাজতন্ত্র অবসান উত্তর নেপালের ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য।

স্বাধীনতা উত্তর বাঙলাদেশে বুর্জোয়া সংবিধান প্রণীত হয় মূলতঃ পূর্ববাঙলার বাঙালী বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদীদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগ্রামের কর্মসূচীর ভিত্তিতে। বিশেষতঃ ২১ দফা, ৬ দফা ও ১১ দফার (মূলতঃ বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক কর্মসূচী) ভিত্তিতে বাঙলাদেশের সংবিধান প্রণীত হয়।


এখানে উল্লেখ করা যায় পাকিস্তান আমলে (১৯৪৭-১৯৭১) পূর্ববাঙলায় কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে জাতীয় পর্যায়ে শক্তিশালী প্রভাবশালী কর্মসূচী ভিত্তিক সংগ্রাম বিশেষতঃ রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের সংগ্রাম গড়ে উঠেনি। বাঙলাদেশে (১৯৭১-২০১০) কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে জাতীয় পর্যায়ে শক্তিশালী প্রভাবশালী কর্মসূচী ভিত্তিক সংগ্রাম বিশেষ করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের সংগ্রাম সংগঠিত হয়নি। এমনকি বৃটিশ আমলের ক্ষেত্রে একথা প্রযোজ্য।

আমাদের মতে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মূল তত্ত্বের মধ্যে বাঙলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনে বিদ্যমান তাৎপর্যপূর্ণ তত্ত্বগত সমস্যাগুলির সমাধানের নির্দেশনা নিহিত। মার্কসবাদ-লেনিনবাদ কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রধান তত্ত্বগত ভিত্তি নির্ধারক তত্ত্বগত ভিত্তি। মার্কসবাদ-লেনিনবাদ বিশ্বজনীন কমিউনিস্ট মতবাদ কমিউনিস্ট ভাবাদর্শ। মার্কস, এঙ্গেলস ও লেনিন বিশ্বজনীন কমিউনিস্ট তাত্ত্বিক, নেতা ও সংগঠক।

এবার তাৎপর্যপূর্ণ তত্ত্বগত সমস্যাগুলির সমাধান বিষয়ক পর্যালোচনা উপস্থিত করা যাক। প্রকৃতপক্ষে বাঙলাদেশে সমাজতান্ত্রিক সংবিধান প্রতিষ্ঠার তত্ত্বগত সমস্যা ও কমিউনিস্ট আন্দোলনের গুণগত বিকাশের তত্ত্বগত সমস্যা ওতোপ্রোতভাবে জড়িত।

একাত্তর সালে বাঙলাদেশ রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসাবে। সাতচল্লিশ সালে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসাবে। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক পরিবর্তন প্রধানতঃ পরিসমাপ্ত। অপরদিকে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক প্রজাতন (বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র) মূলতঃ বুর্জোয়া একনায়কত্ব। আটচল্লিশ সালের শ্রীলংকা ও সামপ্রতিক কালের নেপালের ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য।

বাঙলাদেশের (পূর্ববাঙলা) জনগণের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা যুদ্ধ মূলতঃ প্রগতিশীল ও ন্যায়সঙ্গত। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা যুদ্ধের সৃষ্টির পেছনে প্রধান কারণ পূর্ববাঙলার জনগণের উপর পাকিস্তান বুর্জোয়া রাষ্ট্রের জাতিগত নিপীড়ন। পূর্ববাঙলার জনগণই বাঙলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রকৃত নায়ক। এই ঐতিহাসিক যুদ্ধে পূর্ববাঙলার জনগণ পরিচালিত হয় বুর্জোয়া রাজনৈতিক ধারার (আওয়ামী লীগ) ও কমিউনিস্ট রাজনৈতিক ধারার (কমিউনিস্ট পার্টি সংগঠনগুলি) নেতৃত্বে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা যুদ্ধ ভারত ও রাশিয়ার ষড়যন্ত্রের ফল নয়। বস্তুর বিকাশের ক্ষেত্রে আভ্যন্তরীন কারণ প্রধান।

ভারতের জনগণের মুক্তিসংগ্রাম ও স্বাধীনতা সংগ্রাম মূলতঃ প্রগতিশীল ও ন্যায়সঙ্গত। ভারতের জনগণই ভারতের মুক্তিসংগ্র্বাম ও স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল নায়ক। বৃটিশ বিরোধী এই ঐতিহাসিক সংগ্রামে ভারতের জনগণ পরিচালিত হয় বুর্জোয়া রাজনৈতিক ধারার (কংগ্রেস) এবং কমিউনিস্ট রাজনৈতিক ধারার (কমিউনিস্ট পার্টি) নেতৃত্বে। জাতীয় কংগ্রেস প্রধানতঃ হিন্দু ধর্মীয় সমপ্রদায় থেকে আগত বুর্জোয়াদের রাজনৈতিক দল।

ভারত ও পাকিস্তান রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন বুর্জোয়া রাষ্ট্র। পাকিস্তান বুর্জোয়া রাষ্ট্রটি ইসলামের নামে প্রকাশ্য সাম্প্রদায়িক চরিত্র বিশিষ্ট। ভারতের বুর্জোয়া রাষ্ট্রটি ধর্মনিরপেক্ষতার নামে প্রচ্ছন্ন সাম্প্রদায়িক চরিত্র বিশিষ্ট।

পাকিস্তানের সৃষ্টির পেছনে প্রধান কারণ বৃটিশ ভারতে মুসলিম জনগণের উপর ধর্মীয় নিপীড়ন, কমিউনিস্ট পার্টির পশ্চাদপদ তত্ত্বগত অবস্থান ও মুসলিম লীগ (মুসলিম ধর্মীয় সম্প্রদায় থেকে আগত বুর্জোয়াদের রাজনৈতিক দল) কর্তৃক হিন্দু-মুসিলম সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বের সামাজিক রাজনৈতিক ব্যবহার। হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব ও পাকিস্তানের সৃষ্টি বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্রের ফল নয়। বস্তুর বিকাশের ক্ষেত্রে আভ্যন্তরীন কারণ প্রধান।

আমাদের মতে সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ শোষণ মূলতঃ রাজনৈতিক। পরাধীন দেশে উপনিবেশিক দেশে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র সরাসরি উপস্থিত থাকে ও লগ্নি পুঁজি বিনিয়োগ করে। সাম্রাজ্যবাদের পরোক্ষ শোষণ মূলতঃ অর্থনৈতিক। স্বাধীন দেশে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র দেশীয় রাষ্ট্রের (বুর্জোয়া রাষ্ট্র অথবা সামন রাষ্ট্র) সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করে ও লগ্নি পুঁজি বিনিয়োগ করে। উল্লেখ্য, শ্রেণীবিভক্ত সমাজে রাজনৈতিক শোষণ প্রধান শোষণ এবং রাজনৈতিক সংগ্রাম প্রধান সংগ্রাম।

অবজেকটিভ কারণেই উপনিবেশিক দেশে বা পরাধীন দেশেও পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটে। ভারত তার প্রমান। স্বাধীন দেশে পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটে বেশী মাত্রায়। ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকা তার প্রমান। স্বাধীন দেশ ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার পুঁজিবাদও স্বাধীন।

দক্ষিণ এশিয়ার আর্থ-সামাজিক বিকাশের ধারায় বাঙলাদেশের (পূর্ববাঙলা) উৎপাদন ব্যবস্থা পুঁজিবাদী। বাঙলাদেশে বিকশিত পুঁজিবাদের মূলগত ভিত্তি ও ধারাবাহিক অতীত বৃটিশ আমলে ও পাকিস্তান আমলে বিকশিত পুঁজিবাদ। বাঙলাদেশে পুঁজি ও মজুরী শ্রম, পুঁজিপতিশ্রেণী ও শ্রমিকশ্রেণী প্রত্যক্ষ ও সক্রিয়ভাবে উপস্থিত। দীর্ঘদিন আগে থেকেই বাঙলাদেশের উৎপাদন ব্যবস্থায় মানুষের শ্রমশক্তি পণ্য এবং জমিও পণ্য। বাঙলাদেশে দুটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার উপস্থিত। বাঙলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্ক ক্রিয়াশীল ও শক্তিশালী। বাঙলাদেশের বুর্জোয়ারা পেশাজীবি বুর্জোয়ারা একাধিক সংগঠনে সংগঠিত। স্বাধীন দেশ বাঙলাদেশের পুঁজিবাদও স্বাধীন।


১৯৫০ সালে বাঙলাদেশের ক্ষয়িষ্ণু জমিদার প্রথার উচ্ছেদ হয়েছে। বাঙলাদেশের সমাজে ব্যক্তিমালিকানা প্রতিষ্ঠিত, বিশেষ করে কৃষিতে ব্যক্তিমালিকানা প্রতিষ্ঠিত। কার্যকরভাবে বাঙলাদেশে বিচার বিভাগ, জাতীয় দৈনিক সংবাদপত্র, প্রাথমিক শিক্ষা, উচচ শিক্ষা ও নারী শিক্ষা উপস্থিত। বাঙলাদেশে সার্বজনীন ভোটাধিকার, সংবিধান ও সংসদের উপস্থিতি রয়েছে। মাঝে মাঝে সামরিক শাসন আধা-সামরিক শাসন জারী হওয়ার পরও। বাঙলাদেশে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক পরিবর্তন প্রধানতঃ পরিসমাপ্ত। বাঙলাদেশের শাসকশ্রেণী বুর্জোয়াশ্রেণী শ্রেণীস্বার্থে বিশেষভাবে সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ।

ঐতিহাসিক কারণে বাঙলাদেশে মূলতঃ সমাজতান্ত্রিক অথনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগ্রামের কর্মসূচীর ভিত্তিতে সমাজতান্ত্রিক সংবিধান প্রণীত হবে।

সঙ্গত কারণে বাঙলাদেশে অগ্রসর কমিউনিস্টদের কর্তব্য বিদ্যমান বুর্জোয়া সংবিধানের গুণগত বিপরীতে সমাজতান্ত্রিক সংবিধানের মূলনীতি বা রূপরেখা উপস্থিত করা। সমাজতান্ত্রিক সংবিধানের রূপ রেখার ভিত্তিতে সমাজতান্ত্রিক সংবিধান প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম গড়ে তোলা। স্বাধীনতালাভের পর পরই বাঙলাদেশে বুর্জোয়া সংবিধানের প্রত্যক্ষ বিপরীতে সমাজতান্ত্রিক সংবিধানের রূপরেখা উপস্থিত করার দায়িত্ব ইতিহাস অগ্রসর কমিউনিস্টদের উপর দায়িত্ব অর্পন করে।

আমাদের মতে বাঙলাদেশের বুর্জোয়া সংবিধানের মূলনীতিঃ গণতন্ত্রের নামে বুর্জোয়া গণতন্ত্র , যা কিনা মূলতঃ বুর্জোয়া স্বৈরতন বুর্জোয়া একনায়কত্ব। জাতীয়তাবাদের নামে নিপীড়ক বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদ। ধর্মনিরপেক্ষতার নামে প্রকাশ্যে ধর্মের সামাজিক রাজনৈতিক ব্যবহার। সমাজতন্ত্রের নামে বা সামাজিক ন্যায় বিচারের নামে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা (ব্যক্তিগত মালিকানা ভিত্তিক)।

বাঙলাদেশে বুর্জোয়া সংবিধানের মূলনীতির গুণগত বিপরীতে সমাজতান্ত্রিক সংবিধানের মূলনীতিঃ প্রলেতারীয় গণতন্ত্র প্রলেতারীয় একনায়কত্ব। মূলগতভাবে ব্যক্তিমালিকানার উচ্ছেদ। বৃহৎ ভূমি। শিক্ষা ও আবাসন জাতীয়করণ। সাম্রাজ্যবাদী পুঁজি বাজেয়াপ্ত। শিল্প ও কৃষিতে রাষ্ট্রীয় মালিকানা প্রবর্তন। কৃষিতে যৌথ মালিকানা ও যৌথ উৎপাদন ব্যবস্থা প্রবর্তন। সঙ্গতিপূর্ণ বন্টন ব্যবন্থা প্রবর্তন। সামাজিক উৎপাদন বাবস্থা, সামাজিক বন্টন ব্যবস্থা ও সামাজিক মালিকানার ভিত্তি সৃষ্টি।

রাষ্ট্র থেকে ধর্মের বিযুক্তিকরণ ও ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলতা উচ্ছেদ এবং সকল ধর্মের নর নারীর ঐক্য ও সম্মিলন। সমাজের সকল স্তরে প্রশাসনের সকল ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা। নিপীড়িত জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার (স্বাধীনতার অধিকার বা বিচ্ছেদের অধিকারসহ) প্রতিষ্ঠা এবং সকল নিপীড়িত জাতির মেহনতী নর নারীর ঐক্য ও সম্মিলন। ব্যাপক বিদু্তায়ন, ব্যাপক শিল্পায়ন এবং আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ। শ্রমিক ও কৃষকের মধ্যকার পার্থক্য, গ্রাম ও শহরের মধ্যকার পার্থক্য বিলোপ। মানসিক শ্রম ও কায়িক শ্রমের মধ্যকার বৈষম্য হ্রাস। সমাজ জীবনে মেহনতী নর নারীর যৌথ জীবন ভিত্তিক আধুনিক শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সৃষ্টি।


লেনিনের মৃতু্যর পর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ও সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ শোষণের অবসানের পর পৃথিবীর দেশে দেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনে তাৎপর্যপূর্ণ তত্ত্বগত সমস্যার সৃষ্টি হয়। যেমন সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শোষণের মধ্যকার পার্থক্য, দেশীয় পুঁজিবাদের অনিবার্য বিকাশ, পুঁজিবাদী সমাজে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক পরিবর্তন প্রধানতঃ পরিসমাপ্ত ও সমাজের বিপ্লবের স্তর নির্ধারক বিষয়ক তত্ত্বগত সমস্যা। লেনিনের মৃত্যুর পর আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট তাত্ত্বিক ও নেতা হিসাবে পরিচিত কারও পক্ষে উপরোক্ত তাৎপর্যপূর্ণ তত্ত্বগত সমস্যার যথাযথ সমাধান দেওয়া সম্ভব হয়নি।

জার স্বৈরতন্ত্রের আমলে রাশিয়ায় বৃটিশ ও ফরাসী সাম্রাজ্যবাদীর রাষ্ট্র কতৃক অনেক বেশী পরিমাণ লগ্নি পুঁজি বিনিয়োগকৃত ছিল। রাশিয়ায় ভারী শিল্প কারখানার উপর ইঙ্গ-ফরাসী সাম্রাজ্যবাদের উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রন ছিল। কিন্তু লেনিন ও বলাশেভিক পার্টি ইঙ্গ-ফরাসী সাম্রাজ্যবাদের পরোক্ষ শোষণকে রাশিয়ার জনগণের উপর প্রধান শোষণ হিসাবে নির্ধারণ করেননি। লেনিন তৎকালীন রাশিয়ায় প্রধানতঃ জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম সংগঠিত করার চেষ্টা করেননি। বরং লেনিন রাশিয়ার জার স্বৈরতন্ত্রের শোষণকেই রাশিয়ার জনগণের উপর প্রধান শোষণ হিসাবে চিহ্নিত করেন। লেনিন ও বলাশেভিক পার্ঢি রাশিয়ায় প্রধানতঃ বিপ্লবী গণতান্ত্রিক সংগ্রাম সংগঠিত করেন।

লেনিনের মৃত্যুর পর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ও সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ শোষণের অবসানের পর আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনেও তাৎপর্যপূর্ণ তত্ত্বগত সমস্যার সৃষ্টি হয়। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলন প্রধানতঃ দুই কেন্দ্রে (মস্কো ও পিকিং) বিভক্ত হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট বিতর্কের নামে দেশে দেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনে নানারকম তত্ত্বগত বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। আন্তর্জাতিক এই দুই কেন্দ্রই সাম্রাজ্যবাদের পরোক্ষ শোষণকে সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ শোষণ হিসাবে চিহ্নিত করে। দুই কেন্দ্রই তৃতীয় বিশ্বের স্বৈরাচারী সরকারগুলিকে (বুর্জোয়া ও সা্মন্ততান্ত্রিক ) নিয়ে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জোট গঠন করে। তবে এক পর্যায়ে মস্কো বুর্জোয়া ইন্দিরা সরকারকে (ভারতের মেহনতী জনগণের প্রধান শত্রু) নিয়ে এবং পিকিং বুর্জোয়া আইউব সরকারকে (পাকিস্তানের জনগণের বিশেষতঃ পূর্ববাঙলার জনগণের প্রধান শত্রু) নিয়ে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জোট গঠন করে। তৃতীয় বিশ্বের দেশে দেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনে বিপর্যয় সৃষ্টির পেছনে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ বিরোধী মস্কো ও পিকিং এর উপরোক্ত ভূমিকা একটি মূল কারণ। কমিউনিস্ট আন্দোলনে এই ক্ষতিকর ধারাটি এখনও খানিকটা বর্তমান।

১৯১৭ সালে রাশিয়ায় ফেব্রুয়ারী বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পর লেনিন এ কথাটি লিখেন, "রাশিয়ায় বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব এই পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছে যে রাশিয়া একটি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র "। লেনিনের এই তাৎপর্যপূর্ণ তত্ত্ব সাতচল্লিশ সালের ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এবং একাত্তরের বাঙলাদেশ রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ও সাম্প্রতিক কালের নেপাল রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
লেনিনের মৃত্যুর পর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যেক্ষ শোষণের অবসানের পর পৃথিবীর বেশীরভাগ দেশ স্বাধীন পুঁজিবাদী দেশ বুর্জোয়া রাষ্ট্র। পৃথিবীর বেশীরভাগ দেশের মেহনতী জনগণের উপর পুঁজিবাদী শোষণ প্রধান এবং বুর্জোয়া রাষ্ট্র ও সরকারের শোষণ নির্যাতন প্রধান। পৃথিবীর বেশীরভাগ দেশ সাধারণভাবে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র । পৃথিবীর বেশীরভাগ দেশের সমাজে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক পরিবর্তন প্রধানতঃ পরিসমাপ্ত। পৃথিবীর বেশীরভাগ দেশে পুঁজিবাদী দেশে মেহনতী জনগণের প্রধান সংগ্রাম পুঁজিবাদ উচ্ছেদ ও সমাজতন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। পৃথিরবীর বেশীরভাগ রাষ্ট্রে বুর্জোয়া রাষ্ট্রে মেহনতী জনগণের প্রধান সংগ্রাম বুর্জোয়া রাষ্ট্র ও সরকার উচ্ছেদ এবং সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। বুর্জোয়া সরকারের ক্ষমতা উচ্ছেদ ও সমাজতান্ত্রিক সরকারের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। এসব কথা ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, বাঙলাদেশ ও নেপালের জন্য প্রযোজ্য।

বুর্জোয়া সংবিধানের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত বাঙলাদেশের বুর্জোয়া রাষ্ট্র ও সরকার। বাঙলাদেশের বুর্জোয়া রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানতঃ শাসকশ্রেণীর বুর্জোয়াশ্রেণীর শ্রেণীস্বার্থ রক্ষক। তবে একইসঙ্গে তা সাম্রাজ্যবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদের শ্রেণীস্বার্থ রক্ষক। সমাজতান্ত্রিক সংবিধানের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সরকার। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানতঃ শ্রমিকশ্রেণীর মেহনতী জনগণের শ্রেণীস্বার্থ রক্ষক।

এখানে উল্লেখ করা যায় দক্ষিণ এশিয়ায় বিভিন্ন সময় ভুলত্রুটি সীমাবদ্ধতাসহ কয়েকজন কমিউনিস্ট, বামপন্থী তাত্ত্বিক নেতা নিজ নিজ দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের তাৎপর্যপূর্ণ তত্ত্বগত সমস্যাগুলির সমাধানের চেষ্টা করেন। ১৯৪৭-৪৮ সালে বিটি রনদীভ ভারতের সমাজের বিপ্লবের স্তরকে সমাজতান্ত্রিক চিহ্নিত করেন। পঞ্চাশ দশকে পূর্ববাঙলায় অনিল মুখার্জী ট্রেড ইউনিয়ন সংগ্রামের উপর বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করেন। ষাট দশকে আবদুল মতিন ও আলাউদ্দিন আহমেদ এবং দেবেন সিকদার ও আবুল বাশার পাকিস্তানের জাতীয় অর্থনীতিকে পুঁজিবাদী চিহ্নিত করেন। পঞ্চাশ দশকে ষাট দশকে ডাঃ সাইফউদ্দাহার শ্রমিকশ্রেণীর চরিত্র, জীবন যাপন ও আচরণের দিকটির উপর বিশেষতঃ ট্রেড ইউনিয়ন সংগ্রামের দিকটির উপর বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করেন। ষাট দশকে সিরাজ সিকদার, দেবেন সিকদার, আবুল বাশার ও আব্দুল মালেক মাইতি পূর্ববাঙলার জনগণের প্রধান শত্রু হিসাবে পাকিস্তান বুর্জোয়া রাষ্ট্রকে চিহ্নিত করেন এবং প্রধানতঃ পাকিস্তান বুর্জোয়া স্বৈরতন্ত্র বিরোধী সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তোলেন। একাত্তর সালে শ্রীলংকায় বিজয় রোহানা বীর দেশে জনগণের প্রধান শত্রু হিসাবে প্রধানতঃ দেশীয় বুর্জোয়া স্বৈরতন বিরোধী সশস্ত্র গণঅভ্যুত্থান গড়ে তোলার চেষ্টা করেন।

১৯৭২ সালে বাঙলাদেশে ডঃ আখলাকুর রহমান ও সিরাজুল আলম খান বাঙলাদেশের সমাজের বিপ্লবের স্তর সমাজতান্ত্রিক নির্ধারণ করেন এবং এক পর্যায়ে প্রধানতঃ দেশীয় বুর্জোয়া স্বৈরতন বিরোধী সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। আশি দশকে দাউদ হোসেন বাঙলাদেশে পুঁজিবাদের বিকাশের দিকটি বিশেষভাবে চিহ্নিত করেন। আশি দশকে সিপিবি কৃষি শ্রমিকের (ক্ষেত মজুর) সংগঠন ও সংগ্রামের উপর বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করেন। বদরুদ্দীন উমর ও আনু মুহাম্মদ কমিউনিস্ট আন্দোলনে তত্ত্বগত চর্চার উপর বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করেন ও এতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।


নব্বই দশকে বাঙলাদেশে ফরহাদ মাজহার গণঅভ্যুত্থান ও শ্রমজীবি আন্দোলকারী সংস্থাগুলির বিপ্লবী তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের দিকটি বিশেষভাবে তুলে ধরেন। নব্বই দশকে নেপালে প্রচন্ড ও বাবুরাম রাজতন্ত্র কে দেশের জনগণের প্রধান শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করেন এবং এক পর্যায়ে প্রধানতঃ রাজতন্ত্র বিরোধী সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তোলেন।

আমাদের মতে বাঙলাদেশে কমিউনিস্টদের পক্ষে সমাজতান্ত্রিক সংবিধান প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব কেবল এই সুসঙ্গত পথে। প্রথমতঃ বাঙলাদেশে শ্রমিক গরীব কৃষক মেহনতী জনগণের শ্রেণীপ্রাধান্য ভিত্তিক বিপ্লবী গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত করা। মেহনতী নর নারীর আন্দোলনকারী সংস্থাগুলি কর্তৃক মেহনতী নর নারীর শ্রেণীপ্রাধান্য ভিত্তিক অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার প্রতিষ্ঠা করা। দ্বিতীয়তঃ অস্থায়ী বিপ্লবী সরকারের অধীনে সমাজতান্ত্রিক সংবিধান পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করা।

কেবল একটি সঠিক ঐক্যবদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে বাঙলাদেশে শ্রমিক গরীব কৃষক মেহনতী জনগণের শ্রেণীপ্রাধান্য ভিত্তিক বিপ্লবী গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত করা সম্ভব। শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে শ্রমিক ও গরীব কৃষকের পক্ষে বাঙলাদেশে বুর্জোয়া স্বৈরতন কে (বুর্জোয়া রাষ্ট্র ও সরকার) উচ্ছেদ করা সম্ভব এবং সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

এই কারণে বাঙলাদেশে অগ্রসর কমিউনিস্টদের কর্তব্য শহরাঞ্চলে শিল্প কারখানায় বিশেষতঃ গর্মেন্টস শিল্প কারখানায় বিপ্লবী ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলা। গ্রামাঞ্চলে বিপ্লবী ক্ষেতমজুর ইউনিয়ন ও গরীব কৃষক সংগ্রাম কমিটি গড়ে তোলা। উল্লেখ্য, ট্রেড ইউনিয়ন শ্রমিক শ্রেণীর প্রকৃত শ্রেণীসংগঠন। ট্রেড ইউনিয়ন কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান শ্রেণীসংগঠন।

অগ্রসর কমিউনিস্টদের কর্তব্য একইসঙ্গে মেহনতী জনগণের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগ্রাম সংগঠিত করা। তবে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগ্রামকে রাজনৈতিক সংগ্রামের অধীনস্থ করা। মেহনতী জনগণকে সচেতন ও সংগঠিত করার লক্ষ্যে সঠিক কর্মসূচীর ভিত্তিতে সাধারণতঃ বুর্জোয়া নির্বাচন ও বুর্জোয়া পার্লামেন্টকে অবশ্যই ব্যবহার করা।

অগ্রসর কমিউনিস্টদের কর্তব্য একইসঙ্গে দেশীয় পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদ বিরোধী মেহনতী জনগণের সংগ্রাম গড়ে তোলা। তবে সঙ্গত কারণে সাম্রাজ্যবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদ বিরোধী সংগ্রামকে দেশীয় পুঁজিবাদ বিরোধী মেহনতী জনগণের সংগ্রামের অধীনস্থ করা। এক কথায় বাঙলাদেশে একইসঙ্গে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক সংগ্রাম (জাতীয় মুক্তিসংগ্রামসহ) ও সমাজতান্ত্রিক সংগ্রাম গড়ে তোলা। তবে বাস্তব কারণেই বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে চলমান সমাজতান্ত্রিক সংগ্রামের অধীনস্থ করা।

বাঙলাদেশের অগ্রসর কমিউনিস্টদের কর্তব্য সমাজতান্ত্রিক সংবিধান প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে সংগঠিত করার লক্ষ্যে সঠিক তত্ত্বগত লাইন ও কর্মসূচীর ভিত্তিতে অগ্রসর কমিউনিস্ট সংগঠনগুলির সমন্বয় কমিটি গঠন প্রক্রিয়াকে এবং সঠিক ও ঐক্যবদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টি গঠন প্রক্রিয়াকে ক্রমশঃ শক্তিশালী করা।


তারিখঃ ১১.১২.২০১০

গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যায়সঙ্গত দাবী মেনে নাও, গার্মেন্টস শ্রমিকনেতা মোশরেফা মিশুকে মুক্তি দাও।

# চট্টগ্রামের গার্মেন্টস শ্রমিক হত্যার বিচার কর এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাও। 
# সকল শিল্প কারখানায় গার্মেন্টস শিল্প কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার দাও।
# গার্মেন্টস শ্রমিকনেতা মোশরেফা মিশুকে মুক্তি দাও। আটক সকল গার্মেন্টস শ্রমিকনেতা ও কর্মীদের মুক্তি দাও।
# সারাদেশে রাষ্ট্রীয় ও সরকারী সকল প্রকার শোষণ নির্যাতন বন্ধ কর।
# সারাদেশে বিনা বিচারে হত্যা বন্ধ কর। সকল নাগরিককে আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার দাও। নারী নির্যাতন বন্ধ কর। 

# সকল শ্রমিকের গার্মেন্টস শ্রমিকের মাসিক বেতন পনের হাজার টাকা (আপাততঃ দশ হাজার টাকা) নির্ধারণ কর।
# গ্রামাঞ্চলে স্থায়ীভাবে ক্ষেতমজুরের কাজের বন্দোবস্ত কর। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কমাও।
# গ্রামাঞ্চলে গরীব কৃষকের ন্যায়সঙ্গত দাবী মেনে নাও। রূপগঞ্জের গরীব কৃষকের ন্যায়সঙ্গত দাবী মেনে নাও।
# ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ কর। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাও। দুর্নীতিপরায়ন রাজনৈতিক নেতা, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, আমলা ও পেশাজীবিদের বিচার কর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাও। 

# জাতীয় সম্পদ তেল গ্যাস কয়লা সম্পদ রক্ষা কর। সাম্রাজ্যবাদী পুঁজি বাজেয়াপ্ত কর। 


কমিউনিস্ট ইউনিয়ন
তারিখঃ ১৬/১২/২০১০

শুক্রবার, ১ অক্টোবর, ২০১০

কমিউনিস্ট আন্দোলনে আজ পর্যন্ত মার্কসবাদ-লেনিনবাদের যুগই ক্রিয়াশীল

  প্রায় পৌনে দুশো বছর আগে পশ্চিম ইউরোপে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সূচনাপৃথিবীর দেশে দেশে কমিউনিস্টআন্দোলনে আজ পর্যন্ত মার্কসবাদ-লেনিনবাদের যুগই ক্রিয়াশীল শুধু তাই নয় সমগ্র পৃথিবীতে সমাজতন্ত্র -কমিউনিজমপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত কমিউনিস্ট আন্দোলনে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের যুগই ক্রিয়াশীল থাকবে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিকাশের অন্তর্নিহিত নিয়মের মধ্যেই এই অসাধারণ তাৎপর্যপূর্ণ কারণটি নিহিত

মার্কসবাদ হলো শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবী ভাবাদর্শ বা মতবাদ মার্কসবাদ কমিউনিস্ট ভাবাদর্শ বা মতবাদ তত্ত্বগত মানেরদিক থেকে, কমিউনিস্ট আন্দোলনে কেবল মার্কসবাদই গুণগত পুঁজিবাদী সমাজে বুর্জোয়া মতবাদের গুণগত বিপরীতসৃজনশীলভাবে বিকশিত শ্রমিকশ্রেণীর মতবাদ মার্কসবাদ চিরায়ত বুর্জোয়া দর্শনের (জার্মান দর্শন), অর্থনীতি (বৃটিশঅর্থনীতি) রাজনীতির (ফরাসী সমাজতন্ত্র ) বিচারমূলক সমালোচনা ভিত্তিক গুণগত বিপরীত মার্কসবাদের দর্শন, অর্থনীতি রাজনীতি

বুর্জোয়া মতবাদের দার্শনিক ভিত্তি ভাববাদ শ্রমিকশ্রেণীর মতবাদ বা মার্কসবাদের দার্শনিক ভিত্তি বস্তুবাদ দ্বন্দ্বমূলকবস্তুবাদ বুর্জোয়া মতবাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি ব্যক্তিগত মালিকানা মার্কসবাদের বা কমিউনিস্ট মতবাদের অর্থনৈতিকভিত্তি সামাজিক মালিকানা

মার্কর্সবাদের সার কথা প্রথমতঃ ঐতিহাসিক বস্তুবাদ দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ যা হলো মূলতঃ মানব ইতিহাস মানব সমাজেরবিকাশের অন্তর্নিহিত নিয়মসমূহের বিজ্ঞান দ্বিতীয়তঃ উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্ব যা হলো মূলতঃ পুঁজিবাদী সমাজের আভ্যন্তরীণবিরোধ, গুণগত রূপান্তর অনিবার্য পরিনতির অন্তর্নিহিত নিয়সমূহের বিজ্ঞান তৃতীয়তঃ প্রলেতারীয় একনায়কত্ব যাহলো মূলতঃ পুঁজিবাদ উচ্ছেদ সমাজতন্ত্র বিনির্মাণে প্রলেতারিয়েতের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি

প্রকৃতি, সমাজ মানব চিন্তা ভিত্তিক ভাবাদর্শে, মার্কসবাদের বিকাশ সর্বোচ্চ দার্শনিক, অর্থনৈতিক রাজনৈতিকভাবাদর্শে, মার্কসবাদের বিকাশ সবার শীর্ষে বুর্জোয়া দার্শনিক অর্থনৈতিক রাজনৈতিক পদ্ধতির গুণগত বিপরীতমার্কবাদী দার্শনিক, অর্থনৈতিক রাজনৈতিক পদ্ধতি পরিপূর্ণ, সুস্পষ্ট সুনির্দিষ্ট অবজেকটিভ সাবজেকটিভ কারণেমার্কসবাদ একটি বৈজ্ঞানিক মতবাদ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয় মার্কসবাদ প্রধানতঃ ভাবাদর্শগত ব্যবস্থা

মার্কসবাদের মূল তত্ত্ব্গুলির ভিত্তিতে সমগ্র মার্কসবাদে, লেনিনের অবদান অতুলনীয় আসলে লেনিনবাদ মার্কসবাদ ভিত্তিকতাৎপর্যপূর্ণ সৃজনশীল কমিউনিস্ট মতবাদ অপর কথায় লেনিন মার্কসবাদের ভিত্তিতে সুবিন্যস চমৎকারভাবেমার্কসবাদী দর্শন, অর্থনীতি, রাজনীতি সাংস্কৃতির মূল দিকগুলির বিশদ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেন মার্কসবাদের ভিত্তিতেলেনিন পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতির আলোকে কমিউনিস্ট দর্শন, অর্থনীতি, রাজনীতি সংস্কৃতির সৃজনশীল বিকাশ সাধনকরেন
ঐতিহাসিক কারণে মার্কসবাদের সঙ্গে লেনিনবাদ অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত হয়ে পড়েছে লেনিনবাদের মাধ্যমে সর্বাঙ্গীনমার্কসবাদ বিশ্বের লক্ষ লক্ষ কমিউনিস্ট কর্মীর নিকট সুপরিচিত গভীর অর্থে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ অখন্ড কমিউনিস্টমতবাদ বর্তমান কালের মার্কসবাদ বস্তুতঃ মার্কসবাদ-লেনিনবাদ মার্কসবাদ-লেনিনবাদ বিশ্বজনীন কমিউনিস্ট মতবাদকমিউনিস্ট ভাবাদর্শ

সমাজতন্ত্র-কমিউনিজম মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সামগ্রিক রূপ সমাজতন্ত্র -কমিউনিজম প্রধানতঃ সমাজব্যবস্থাসমাজব্যবস্থায়, সমাজতন্ত্র -কমিউনিজমের বিকাশ সর্বোচ্চ সমাজতন্ত্র -কমিউনিজম সবচেয়ে অগ্রসর সবচেয়ে পরিপূর্ণসমাজব্যবস্থা সমাজতন্ত্র কমিউনিজমের নিম্ন পর্যায় বা প্রথম পর্যায় কমিউনিজম সমাজতন্ত্রের উচ্চতর পর্যায় বা দ্বিতীয়পর্যায় বুর্জোয়া সমাজব্যবস্থা বা পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার অর্থনৈতিক ভিত্তি ব্যক্তিগত মালিকানা কমিউনিস্টসমাজব্যবস্থার অর্থনৈতিক ভিত্তি সামাজিক মালিকানা

সাধারণ অর্থে, সমাজতন্ত্র হলো শ্রেণীর বিলোপ সুনির্দিষ্ট অর্থে সমাজতন্ত্র হলো শ্রেণীর বিলোপের প্রথম পর্যায় এইবিলোপের জনা প্রলেতারীয় একনায়কত্ব বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে এই পর্যায়ের মূল কর্মসূচী হলোঃ সামগ্রিকভাবে ভূমিজাতীয়করণ বিশেষভাবে বৃহৎ কৃষি খামার, শিল্প আবাসনে ব্যক্তিগত মালিকানার উচ্ছেদ ব্যাপক মেহনতী নর নারীবিশেষতঃ গরীব কৃষকের যৌথ উৎপাদন (সমবায় ব্যবস্থা) প্রবর্তন শ্রমিক কৃষকের মধ্যে পার্থক্য বিলোপ সমাজতন্ত্রেরএকটি  মূলনীতি প্রত্যেকে কাজ করবে তার সাধ্যমত, প্রত্যেকে পাবে তার কাজ অনুযায়ী

সঙ্গত কারণে মার্কস এঙ্গেলস সমাজতন বিনির্মাণের সমস্যাগুলি সুসপষ্টভাবে চিহ্নিত করেন একইসঙ্গে তাঁরা এইসমস্যাগুলির যথাযথ সমাধানের মূল দিকগুলিও তুলে ধরেন মার্কস এঙ্গেলস দেখান কেমন করে কমিউনিজমের ভেতরদিয়ে সমাজতন্ত্রের বিনির্মাণের তাৎপর্যপ র্ণ সমস্যাগুলিরও যথাযথ সমাধান হবে মার্কস এঙ্গেলসের মূল তত্ত্বের ভিত্তিতেলেনিন সমাজতন্ত্রের বিনির্মাণ বিষয়ক সমস্যা এবং এগুলির সমাধান সুসপষ্টভাবে, সুনির্দিষ্টভাবে সৃজনশীলভাবে বিশদব্যাখ্যা করেন

সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বা প্রলেতারীয় একনায়কত্বের যুগে শ্রেণী থাকে এবং শ্রেণীসংগ্রাম থাকে তীব্রভাবেই পুঁজিপতিদেরউচ্ছেদ করা হয়, কিন্তু পুঁজিবাদ থাকে কৃষক অর্থনীতি রূপে সমাজে ক্ষুদে পণ্য থেকে যায় এটা পুঁজিবাদের ব্যাপক দৃঢ়প্রোথিত ভিত্তি এই ভিত্তিতে পুঁজিবাদ থাকে পুনরুতপাদিত হয় সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে নির্মম সংগ্রামে

প্রলেতারীয় একনায়তন বা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ছাড়া শ্রেণী বিলোপ হবেনা শ্রেণী বিলোপের পর প্রলেতারীয় একনায়কত্বেরপ্রয়োজন থাকবে না সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি পরিপক্ক না হওয়া পর্যন , পুঁজিবাদী চিহ্ন বিলোপ না হওয়া পর্যন্ত বুর্জোয়াঅধিকার বিলোপ না হওয়া পর্যন্ত বুর্জোয়া রাষ্ট্র টিকে থাকে- বুর্জোয়া ছাড়া !

কমিউনিজম হলো রাষ্ট্রের বিলোপ সমাজতন্ত্রে রাষ্ট্র শ্রেণীর বিলোপের প্রক্রিয়া শুরু হয় কমিউনিজমে রাষ্ট্র শ্রেণীরবিলোপ ঘটবে পরিপূর্ণভাবে কমিউনিজমে রাষ্ট্রীয় মালিকানা যৌথ মালিকানার রূপান্তর ঘটবে সামাজিক মালিকানায়সমাজে বুর্জোয়া অধিকারের বিলোপ ঘটবে এবং কায়িক মানসিক শ্রমের পার্থক্যের অবসান ঘটবে কমিউনিজমের একটিমূলনীতি হলো প্রত্যেকে কাজ করবে তার সাধ্যমত, প্রত্যেকে পাবে তার প্রয়োজন অনুযায়ী

ঊনবিংশ শতাব্দীতে শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবী মতবাদ কমিউনিস্ট মতবাদ (দার্শনিক, অর্থনৈতিক রাজনৈতিক) গড়ে তোলারঐতিহাসিক দায়িত্ব বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী, তাত্তি্বক নেতা মার্কস এঙ্গেলসের উপর অর্পিত হয় বিশেষতঃ সমাজতন্ত্রকমিউনিজম বিনির্মাণের তত্ত্ব বিকশিত করার জন্য মার্কস এঙ্গেলসের সামনে ইতিহাস নির্দিষ্ট দায়িত্ব উপস্থিত হয়পরিশ্রম মেধার সঙ্গে মার্কস এঙ্গেলস এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন এবং এরা দুজন বিশ্বেরশ্রমিকশ্রেণীর শিক্ষকে পরিণত হন -

ফলে কমিউনিস্ট মতবাদ গড়ে তোলা বিশেষতঃ সমাজতন -কমিউনিজম বিনির্মানের মূল তত্ত্ব বিকশিত করার ঐতিহাসিকদায়িত্ব আর কারও নেয়ার প্রয়োজন থাকলো না এবার এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় কাজটি হলো মার্কসবাদের মূল তত্ত্বের ভিত্তিতেসকল প্রকার সংশোধনবাদ, নৈরাজ্যবাদ সংকীর্ণবাদের আক্রমণ থেকে মার্কসবাদকে রক্ষা করা মার্কসবাদের মূল তত্ত্বেরভিত্তিতে সৃজনশীলভাবে মার্কসবাদকে বিকশিত করা আর এই অসাধারণ তাৎপর্যপূর্ণ কাজটি পরিশ্রম মেধার সঙ্গেযথাযথভাবে সমপন্ন করেন বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী, তাত্ত্বিক নেতা লেনিন বিংশ শতাব্দীর প্রথম পর্বে

মার্কস এঙ্গেলস উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় পর্বে সাম্রাজ্যবাদের মূল তত্ত্ব (অবাধ প্রতিযোগিতা একচেটিয়ায় পরিণতহওয়ার তত্ত্ব) প্রতিষ্ঠিত করেন মার্কস এঙ্গেলসের এই মূল তত্ত্বের ভিত্তিতে লেনিন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সৃজনশীলভাবেসাম্রাজ্যবাদের তত্ত্বের বিকাশ সাধন করেন মার্কস, এঙ্গেলস লেনিনের রচনাগুলির মধ্যে একথার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়াযায়

বিশেষতঃ সমাজতন বিনির্মাণের মূল তত্ত্বকে কেন্দ্র করে বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনে নানা রকম বিভ্রান্তি রয়েছে এই প্রশ্নেআসল কথা হলো সমাজতন্ত্র বিনির্মাণের ক্ষেত্রে মার্কস এঙ্গেলসের মূল তত্ত্বগুলিই পরিপূর্ণ সুসপষ্ট, সুনির্দিষ্ট যথাযথমার্কস এঙ্গেলসের মূল তত্ত্বের ভিত্তিতে কেবল লেনিন সমাজতন্ত্র বিনির্মাণের তত্ত্ব সুসপষ্ট, সুনির্দিষ্ট, যথাযথ সৃজনশীলভাবে বিশদ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেন

বাঙলাদেশের অগ্রসর কমিউনিস্টদের ইতিহাস নির্দিষ্ট দায়িত্ব হলো সংশোধনবাদী, নৈরাজ্যবাদী সংকীর্ণতাবাদী ধারারআক্রমণ থেকে মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে রক্ষা করা মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মূল তত্ত্বের ভিত্তিতে মার্কসবাদ-লেনিনবাদকেসৃজনশীলভাবে বিকশিত করা আসলে কমিউনিস্ট আন্দোলনে আজ পর্যন মার্কসবাদ-লেনিনবাদের যুগই ক্রিয়াশীলএমনকি সমগ্র পৃথিবীতে সমাজতন্ত্র -কমিউনিজম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত কমিউনিস্ট আন্দোলনে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের যুগই ক্রিয়াশীল থাকবে
 

তারিখঃ ১৯.০৮.২০১০