বুধবার, ২০ জুলাই, ২০১১

ভিকারুননিসার নির্যাতিত ছাত্রীর পাশে এসে দাঁড়ান। ধর্ষনকারী শিক্ষকের শাস্তির দাবীতে এগিয়ে আসুন।

কয়েকদিন আগে ভিকারুননিসা স্কুলের একজন ছাত্রী ধর্ষিত হয়েছে তার স্কুলের একজন শিক্ষকের দ্বারা। কয়েক মাস আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষিকা রুমানাকে তার স্বামী নির্মম ও পাশবিক অত্যাচার করেছে। পিরোজপুরের গরীব কৃষকের মেয়ে হেনা ধর্ষিত হওয়ার পর খুন হয়েছে ফতোয়াবাজদের হাতে। ঢাকায় ফ্যাক্টরীতে ও রাস্তায় শ্রমজীবী নারীরা নির্যাতিত হয় নিয়মিত। এরকমটাই আমাদের সমাজে নারী নির্যাতনের প্রকৃত চিত্র।

 

বাঙলাদেশের সমাজে নারীরাই সবচেয়ে বেশী নির্যাতিত। বাঙলাদেশের সমাজ পুঁজিবাদী সমাজ। পুঁজিবাদী সমাজে থাকে পুরুষের প্রাধান্য। পুঁজিবাদী সমাজে বেশীরভাগ ধন সমপত্তির মালিক পুরুষ। প্রায় সকল পুজিপতি, ব্যবসায়ী, সরকারী-বেসরকারী কর্মকর্তা ও পেশাজীবী পুরুষ। ব্যক্তিমালিকানা, ঐতিহ্যের জের ও ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলতা পুরুষতন্ত্রের উৎস। পুঁজিবাদী সমাজে পুঁজিবাদ ও ক্ষমতাসীন সরকার পুরুষতন্ত্রের প্রধান রক্ষক।

 

এবার ভিকারুননিসা স্কুলের নির্যাতিত ছাত্রীটির পাশে এসে আন্তরিকভাবে দাঁড়িয়েছেন সমাজের হাজার হাজার প্রগতিশীল মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী নরনারী। এই ঘটনায় তারা অবাক, তারা ক্ষুব্ধ ও তারা প্রতিবাদী। সমাজ সচেতন এসকল মানুষ ভিকারুননিসা স্কুলের ছাত্রীর ধর্ষনকারী নিকৃষ্ট শিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান। তারা ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য দায়ী ব্যক্তিদেরও উপযুক্ত শাস্তি দাবী করেন।

 

পাশাপাশি, সরকারী বেসরকারী কেন্দ্র থেকে কিছু সংখ্যক পরিচিত উচ্চবিত্ত মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীরাও ভিকারুননিসা স্কুলের নির্যাতিত ছাত্রীর পাশে এগিয়ে এসেছেন। এসকল বুদ্ধিজীবী ভিকারুননিসা স্কুলের এই ধিকৃত ঘটনার উপর অনেক রকম ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ মূল্যায়ন উপস্থিত করছেন এবং তাঁরা এই ব্যাপার নানারকম বুদ্ধি পরামর্শ জ্ঞান বিতরণ করছেন। কিন্তু তারা বাঙলাদেশের সমাজে নারী নির্যাতন অবসানের ক্ষেত্রে প্রধান শর্তটি সম্পর্কে সম্পূর্ণ নীরব থাকছেন।

 

এসময়ে সমাজের সবচেয়ে অগ্রসর সবচেয়ে প্রগতিশীল নরনারীর প্রধান কর্তব্যকর্ম ভিকারুননিসা স্কুলের ছাত্রীর ধর্ষনকারী শিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবীতে এগিয়ে আসা। খুটিনাটি বিষয়কে নয়, ঘটনার মূল বিষয়টিকেই প্রধানতঃ গুরুত্ব দেয়া। মূল লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ ও লাগাতার সংগ্রাম গড়ে তোলা। শেষ পর্যন্ত ধর্ষনকারী শিক্ষকের জঘন্য অপরাধের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা। বাঙলাদেশের সমাজে নারী নির্যাতন অবসানের পথকে আরও শক্তিশালী করা।

 

কিন্তু শ্রেণীসমাজে নারী নির্যাতনের অবসানের পথ কঠিন শ্রেণীসংগ্রামের পথ। হাজার বছরের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় সমাজে ব্যক্তিমালিকানার উদ্ভবের পরই নারী নির্যাতনের উদ্ভব হয়েছে। যতদিন ব্যক্তিমালিকানা থাকবে ও পুঁজিবাদ থাকবে ততদিন সমাজে পুরুষতন্ত্র ও নারী নির্যাতন অনিবার্য। কেবল ব্যক্তিমালিকানার উচ্ছেদের পরই সমাজে নারী নির্যাতনের অবসান ঘটতে পারে।

 

প্রকৃতপক্ষে সঠিক ও অগ্রসর রাজনৈতিক সংগ্রাম ছাড়া বাঙলাদেশে চলমান কোন অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগ্রাম জয়যুক্ত হতে পারেনা। নারী নির্যাতনের অবসানের চলমান সংগ্রামও সফল হতে পারেনা। বাঙলাদেশে সঠিক অগ্রসর রাজনৈতিক সংগ্রাম প্রধানতঃ পুঁজিবাদ উচ্ছেদ ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। বুর্জোয়া রাষ্ট্র ও সরকার উচ্ছেদ এবং সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।

 

 

 
তারিখঃ ২৯.০৬.২০১১                            আইউব রেজা চৌধুরী

বুধবার, ৬ জুলাই, ২০১১

মেহনতী জনগণের সংবিধান যথাযথ নির্ধারণের প্রশ্নে বাঙলাদেশের কমিউনিস্টদের তত্ত্বগত বিভ্রান্তি

বুর্জোয়া সংবিধানের সংশোধনের প্রশ্নে বাঙলাদেশের শাসক বুর্জোয়ারা এখন বড় সংকটে। কিন্তু মেহনতী জনগণের সংবিধান যথাযথ নির্ধারণের প্রশ্নে বাঙলাদেশের কমিউনিস্টরা এখন আরও বড় সংকটে। তত্ত্বগত বিভ্রান্তিই কমিউনিস্টদের এই সংকটের পেছনে প্রধান কারণ।
বর্তমানকাল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কাল। সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ শোষণের অবসান ঘটেছে দীর্ঘকাল আগে। পৃথিবীর বেশীরভাগ দেশ মূলতঃ আত্মনির্ভরশীল পুঁজিবাদী দেশ এবং রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন বুর্জোয়া রাষ্ট্র। বাঙলাদেশ মূলতঃ আত্মনির্ভরশীল পুঁজিবাদী দেশ এবং রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন বুর্জোয়া রাষ্ট্র। বাঙলাদেশের পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর নয়।
কিন্তু তারপরও স্বাধীন বুর্জোয়া বাঙলাদেশে কমিউনিস্টদের একটি বড় অংশ বাহাত্তরের সংবিধানের (বুর্জোয়া-পেটিবুর্জোয়া সংবিধান) মূলনীতি সমর্থন করে। বাঙলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনে এই ধারাটি অতিশয় ক্ষতিকর সংঙ্কারবাদী ধারা। এসকল কমিউনিস্ট মার্কসবাদ-লেনিনবাদের প্রতি আন্তরিকভাবে আস্থাবান নন।
স্বাধীন পুঁজিবাদী বাঙলাদেশে কমিউনিস্টদের অপর একটি বড় অংশ জনগণের গণতান্ত্রিক সংবিধান (নয়া গণতান্ত্রিক অথবা জনগণতান্ত্রিক সংবিধান) প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করে। বাঙলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনে এই ধারাটি অপরিমেয় ক্ষতিকর নৈরাজ্যবাদী ধারা। এসকল কমিউনিস্ট মার্কসবাদ-লেনিনবাদের প্রতি সচেতনভাবে আস্থাবান নয়।
বাঙলাদেশের কমিউনিস্টদের উপরোক্ত তত্ত্বগত বিভ্রান্তির পেছনে লেনিন উত্তর রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির পশ্চাদপদ তত্ত্বগত অবস্থান বিশেষভাবে দায়ী। উপরোক্ত দুই পার্টি সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ক লেনিনের তত্ত্বকে বিকৃত করেছে। দুই পার্টি সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ শোষণ ও পরোক্ষ শোষণের মধ্যকার পার্থক্যকে (সরাসরি উপনিবেশিক রাষ্ট্র বিষয়ক) আড়াল করেছে। এরা পৃথিবীর দেশে দেশে পুঁজিবাদের বিকাশের অনিবার্যতাকে স্বীকার করেনি।
বাঙলাদেশের অগ্রসর কমিউনিস্টদের কর্তব্য লেনিন উত্তর রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির পশ্চাদপদ তত্ত্বগত লাইনকে প্রত্যাখান করা। মার্কসবাদ-লেনিনবাদের পতাকাকে সমুন্নত রাখা। মার্কসবাদ-লেনিনবাদের ভিত্তিতে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের তত্ত্বকে সৃজনশীলভাবে বিকশিত করা।
অগ্রসর কমিউনিস্টদের কর্তব্য স্বাধীন বুর্জোয়া রাষ্ট্র বাঙলাদেশে বিদ্যমান বুর্জোয়া সংবিধানের গুণগত বিপরীত সমাজতান্ত্রিক সংবিধান প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম সংগঠিত করা। বাঙলাদেশে পুঁজিবাদের উচ্ছেদ এবং সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম গড়ে তোলা। বুর্জোয়া বাঙলাদেশে সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম ছাড়া বুর্জোয়াদের প্রগতিশীল অংশের সঙ্গে কমিউনিস্টদের পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যাবেনা। বুর্জোয়া ভারতে সমাজতান্ত্রিক সংগ্রাম ছাড়া বুর্জোয়াদের প্রগতিশীল অংশের সঙ্গে কমিউনিস্টদের পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যাবেনা।
তারিখঃ ২৯.০৬.২০১১                                                                  আইউব রেজা চৌধুরী