মঙ্গলবার, ২১ জুন, ২০১১

কোন পথে বাঙলাদেশে নারী নির্যাতনের অবসান ঘটতে পারে

বাঙলাদেশে ধনী দরিদ্র সকল নারীই সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে নির্যাতিত। বিশেষ করে দরিদ্র নারী শ্রমজীবী নারী অধিকতর নির্যাতিত। এরা হলেন রুমানা, হেনা এবং আরও লক্ষ লক্ষ অসহায় নারী। সময়ের দাবী নির্যাতনকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জন্য সমাজের অগ্রসর, আন্তরিক ও সাহসী নারী পুরুষের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। 


বাঙলাদেশ একটি পুঁজিবাদী দেশ। বাঙলাদেশের সমাজ পুঁজিবাদী সমাজ! বাঙলাদেশের সমাজে পুরুষরা বেশীরভাগ ধনসমপত্তির মালিক। যেখানে পুঁজিবাদী শোষণ থাকে ও মজুরী দাসত্ব থাকে, যেখানে ধনসম্পদে ও ক্ষমতায়নে পুরুষের প্রাধান্য থাকে সেখানে নারী নির্যাতন অনিবার্য। শুধু তাই নয় গণিকাবৃত্তিও অনিবার্য। 



বাঙলাদেশের সমাজে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে নারীর অধিকার সীমিত। অপরদিকে বাঙলাদেশের সমাজে পুরুষরা বিশেষ রকম অধিকারপ্রাপ্ত। যেখানে পুঁজিবাদ, পুঁজিপতি, বণিক, সাম্রাজ্যবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদ থাকে সেখানে পুরুষের সঙ্গে নারীর সমতা প্রতিষ্ঠা হতে পারেনা। এমনকি আইনের ক্ষেত্রেও তা হতে পারেনা। নামে মাত্র আইনের সমতার মানে জীবনের ক্ষেত্রে সমতা নয়। বাস্তব খুব কঠিন।



বাঙলাদেশের সমাজে নারী নির্যাতনের অবসান বা নারী মুক্তির মূল পথ বৃহৎ ভূমি, শিল্প কারখানা ও আবাসনে ব্যক্তি মালিকানার উচ্ছেদ এবং এগুলির রাষ্ট্রীয়করণ। ব্যাংক, বীমা, ব্যবসা বাণিজ্য ও খাদ্য ব্যবসা জাতীয়করণ। সমাজে বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা রাষ্ট্রীয়করণ। সারাদেশে কৃষিতে রাষ্ট্রীয় মালিকানা ও যৌথ মালিকানার প্রতিষ্ঠা এবং যৌথ উৎপাদন প্রবর্তন।



বাঙলাদেশের সমাজে নারী নির্যাতনের অবসান বা নারী মুক্তির মূল পথ সকল নারী ও পুরুষকে চাকুরী প্রদান এবং অফিসার ও শ্রমিকের বেতন ক্রমশঃ সমান সমান করা। শিল্প ও কৃষিতে ব্যাপক নারী ও পুরুষকে যৌথ উৎপাদনে টেনে আনা। সারাদেশে সামাজিক ভোজনালয়, কিন্ডারগার্টেন ও শিশুলালনাগার প্রতিষ্ঠা করা এবং নারীকে তার সাধারণ সাংসারিক বৃত্ত থেকে বাহিরে টেনে আনা।



পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অর্থনৈতিক ভিত্তি শোষণমূলক ব্যক্তিগত মালিকানা। পুরুষতন্ত্র পুঁজিবাদের একটি তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। পুরুষতন্ত্রের উদ্ভব হয়েছে সমাজে ধনসম্পদে ও ক্ষমতায়নে পুরুষের প্রাধান্য, দীর্ঘকালীন ঐতিহ্য ও ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলতা থেকে।



সঙ্গত কারণে বিপ্লবী শ্রেণীসংগ্রাম ছাড়া বাঙলাদেশে নারী নির্যাতনের অবসান ঘটতে পারেনা। বাঙলাদেশে পুঁজিবাদ, পুরুষতন্ত্র, সাম্রাজ্যবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদ উচ্ছেদ ছাড়া নারী নির্যাতনের অবসান বা নারী মুক্তি সম্ভব নয়।



এক কথায় বাঙলাদেশে নারী নির্যাতনের অবসান ও নারী মুক্তির মূল পথ পুঁজিবাদের উচ্ছেদ ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম গড়ে তোলা। বাঙলাদেশে বুর্জোয়া রাষ্ট্র ও সরকার উচ্ছেদ এবং সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম সংগঠিত করা। সমাজতন্ত্রই নারী মুক্তির মূল পথ।





১১.০৬.২০১১                                    আইউব রেজা চৌধুরী

মঙ্গলবার, ১০ মে, ২০১১

বুর্জোয়া সংবিধানের সংশোধন? নাকি সমাজতান্ত্রিক সংবিধানের রূপরেখা প্রণয়ন?

যেহেতু, বাঙলাদেশ রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন একটি বুর্জোয়া রাষ্ট্র; বাঙলাদেশের শাসকশ্রেণী বুর্জোয়াশ্রেণী এবং সরকার বুর্জোয়া সরকার। বাঙলাদেশে সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থা পুঁজিবাদী এবং বাঙলাদেশের সমাজ পুঁজিবাদী সমাজ। বাঙলাদেশের সমাজের বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক পরিবর্তন প্রধানতঃ পরিসমাপ্ত।

সেহেতু, বাঙলাদেশে অগ্রসর কমিউনিস্টদের কর্তব্য বিদ্যমান বুর্জোয়া সংবিধানের গুণগত বিপরীত সমাজতান্ত্রিক সংবিধানের রূপরেখা প্রণয়ন করা। কোন কারণেই বিদ্যমান বুর্জোয়া সংবিধান সংশোধন করা অথবা বাহাত্তরের বুর্জোয়া সংবিধান প্রতিষ্ঠা করা বাঙলাদেশে অগ্রসর কমিউনিস্টদের কর্তব্য হতে পারে না।

শ্রেণীচরিত্রের দিক থেকে বুর্জোয়া সংবিধান মূলতঃ শোষণমূলক ব্যক্তিমালিকানা ভিত্তিক। বুর্জোয়া সংবিধান মূলতঃ বৃহৎ কৃষিভূমি, শিল্প কারখানা, ব্যাংক, বীমা ও আবাসনে ব্যক্তিমালিকানা প্রতিষ্ঠার আইনগত দলিল। বুর্জোয়া সংবিধান বস্তুতঃ বুর্জোয়াশ্রেণীর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সাংস্কৃতিক শ্রেণীস্বার্থ রক্ষা করে। বুর্জোয়া সংবিধান বুর্জোয়াশ্রেণীর একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক দলিল।

শ্রেণীচরিত্রের দিক থেকে সমাজতান্ত্রিক সংবিধান মূলতঃ শোষণমুক্ত রাষ্ট্রীয় মালিকানা, যৌথ মালিকানা ও যৌথ উৎপাদন ভিত্তিক। সমাজতান্ত্রিক সংবিধান বৃহৎ কৃষিভূমি, শিল্প কারখানা, ব্যাংক, বীমা ও আবাসন রাষ্ট্রীয়করণ বা জাতীয়করণ করার আইনগত দলিল। সমাজতান্ত্রিক সংবিধান মূলতঃ শ্রমিকশ্রেণী ও গরীব কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করে। সমাজতান্ত্রিক সংবিধান শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক দলিল।

তত্ত্বগত বিচারে, বাঙলাদেশে বুর্জোয়া সংবিধানের সংশোধনের পথ কমিউনিস্ট আন্দোলনে বস্তুতঃ সংস্কারবাদী পথ বুর্জোয়া লেজুড়বৃত্তির পথ। বাঙলাদেশে বুর্জোয়া সংবিধানের গুণগত বিপরীত নয়া গণতান্ত্রিক সংবিধান বা জনগণতান্ত্রিক সংবিধানের রূপরেখা প্রণয়নের পথ। বস্তুতঃ কমিউনিস্ট আন্দোলনে নৈরাজ্যবাদী পথ গণবিচ্ছিন্নতার পথ।

বাঙলাদেশের অগ্রসর কমিউনিস্টদের কর্তব্য বুর্জোয়া সংবিধানের গুণগত বিপরীত সমাজতান্ত্রিক সংবিধানের রূপরেখা প্রণয়ন করা। বাঙলাদেশে বিদ্যমান বুর্জোয়া সংবিধানের গুণগত বিপরীত সমাজতান্ত্রিক সংবিধান প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম সংগঠিত করা। বাঙলাদেশে প্রধানতঃ দেশীয় পুঁজিবাদ বিরোধী এবং বুর্জোয়া রাষ্ট্র ও সরকার বিরোধী সংগ্রাম গড়ে তোলা। পাশাপাশি সাম্রাজ্যবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদ বিরোধী সংগ্রাম সংগঠিত করা।


তারিখঃ ২৯.০৪.২০১১                                       আইউব রেজা চৌধুরী

বুধবার, ২০ এপ্রিল, ২০১১

উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও আসাদের মৃত্যুর তাৎপর্য (২)

তরুণ কমিউনিস্ট আসাদের মহান মৃত্যু ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান সূচনা করে পূর্ববাঙলার কমিউনিস্টদের সংগঠিত ট্রেডইউনিয়ন সংগ্রাম গরীব কৃষক সংগ্রাম ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে ভূমিকা রাখে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান পাকিস্তানেরস্বৈরাচারী বুর্জোয়া রাষ্ট্র কাঠামোকে একটি বড় আঘাত করে কিন্তু সঠিক তত্ত্বগত লাইন রাজনৈতিক কর্মসূচীর অভাবেপূর্ববাঙলার কমিউনিস্টরা শেষ পর্যন্ত জাতীয় পর্যায়ে পিছিয়ে পড়ে আসাদের মৃত্যুর তাৎপর্য ক্রমশঃ অনুজ্জ্বল হয়ে পড়ে

কঠিন সত্য হলো লেনিন উত্তর রাশিয়া চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ভ্রান্ত তত্ত্বগত লাইনের কারণে বৃটিশ আমল, পাকিস্তানআমল বাঙলাদেশ আমলে কমিউনিস্টরা বিভ্রান্তিমূলক তত্ত্বগত লাইন প্রয়োগ করে বিশেষতঃ কমিউনিস্টরা বৃটিশভারতে সাম্রাজ্যবাদী বুর্জোয়াদের গুণগত বিপরীত, পাকিস্তান আমলে বৃহৎ বুর্জোয়াদের গুণগত বিপরীত বাঙলাদেশআমলে বৃহৎ বুর্জোয়াদের গুণগত বিপরীত কর্মসূচী উপস্থিত করেনি

সঠিক কর্মসূচীর রাজনৈতিক কর্মসূচীর ভিত্তিতে বৃটিশ ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলন জাতীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী হলে দেশেহিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব তীব্র আকার ধারণ করতোনা বৃটিশ ভারতে শেষ পর্যায়ে প্রধানতঃ গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, পাশাপাশি সমাজতান্ত্রিক সংগ্রাম বিকশিত শক্তিশালী হতে পারলে ভারত পাকিস্তান নামে দুটি বুর্জোয়া রাষ্ট্রের উদ্ভবহতো না অখন্ড স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক ভারতবর্ষ (নিপীড়িত জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রন অধিকারসহ) সৃষ্টি হওয়ারসম্ভাবনার উদ্ভব হতো

পাকিস্তানে, পূর্ববাঙলায় সঠিক কর্মসূচীর রাজনৈতিক কর্মসূচীর ভিত্তিতে কমিউনিস্ট আন্দোলন জাতীয় পর্যায়ে প্রভাবশালীহতে পারলে সারা দেশে শ্রেণী দ্বন্দ্ব তীব্রতর হতো, জাতীয় দ্বন্দ্ব এতটা তীব্রতর হতোনা অপর কথায় পাকিস্তান, পূর্ববাঙলায় শ্রমিকশ্রেণীর মেহনতী জনগণের সমাজতান্ত্রিক সংগ্রাম জাতীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী হতে পারলে অখন্ডসমাজতান্ত্রিক পাকিস্তান (নিপীড়িত জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রন অধিকারসহ) সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিতোপাকিস্তানে, পূর্ববাঙলায় নিপীড়িত জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রন অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এতটা তীব্রতর হতো না

বৃটিশ আমলে, পাকিস্তান আমলে বাঙলাদেশ আমলে এই ভৌগলিক ভুখন্ডের (সাবেক পূর্ববাঙলা) সমাজ বিকাশের ধারায়ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান আসাদের মৃত্যু একটি বিশাল সামাজিক রাজনৈতিক ক্যানভাস অন্যান্যসাধারণ অধ্যায়বাঙলাদেশের আন্তরিক কমিউনিস্টদের কর্তব্য হলো ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান আসাদের মৃত্যুর অসাধারণ সুগভীরতাৎপর্য অনুধাবন করা

বাঙলাদেশের আন্তরিক কমিউনিস্টদের কর্তব্য হলো বাঙলাদেশের সমাজের গুণগত পরিবর্তনের লক্ষ্যে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের তত্ত্ব সৃজনশীলভাবে প্রয়োগ করা লেনিন উত্তর রাশিয়া চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ভ্রান্ত তত্ত্বগত লাইনকেপরিহার করা বাঙলাদেশে প্রধানতঃ পুঁজিবাদ বিরোধী সমাজতান্ত্রিক সংগ্রাম সংগঠিত করা এখানে উল্লেখ্য, বাঙলাদেশেসমাজতান্ত্রিক সংগ্রাম ছাড়া বুর্জোয়া রাজনীতি কমিউনিস্ট রাজনীতির মধ্যকার পার্থক্য যথাযথ সুনির্দিষ্ট হতে পারেনাআর পাশাপাশি গণতান্ত্রিক সংগ্রাম (সাম্রাজ্যবাদ ধর্মীয় মৌলবাদ বিরোধী সংগ্রাম) গড়ে তোলা দক্ষিণ এশিয়াসমাজতান্ত্রিক সংগ্রাম আরব সমাজতান্ত্রিক সংগ্রাম শক্তিশালী করা মার্কসবাদ-লেনিনবাদ সমাজতন্ত্র-কমিউনিজমেরবিজয় অনিবার্য

তারিখঃ ২০.০১.২০১১
আইউব রেজা চৌধুরী

বৃহস্পতিবার, ৭ এপ্রিল, ২০১১

উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও আসাদের মৃত্যুর তাৎপর্য

(১)
বিকাশের নিয়মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাম ছাত্রনেতা (ছাত্র ইউনিয়ন) আসাদের মৃত্যুতে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সূচনা। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান প্রথমতঃ পাকিস্তানের পুঁজিবাদী শোষণ বিরোধী পূর্ববাঙলার শ্রমিকশ্রেণীর সংগ্রাম। দ্বিতীয়তঃ পাকিস্তানের বুর্জোয়া রাষ্ট্রের জাতিগত নিপীড়ন বিরোধী পূর্ববাঙলার নিপীড়িত জাতিসমূহের মেহনতী জনগণের সংগ্রাম।

পূর্ববাঙলার কমিউনিস্টরা আন্তরিকভাবে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু লেনিন উত্তর রাশিয়া ও চীনের ভ্রান্ত তত্ত্বগত লাইনের কারণে সঠিক কমিউনিস্ট কর্মসূচীর রাজনৈতিক কর্মসূচীর অভাবে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে পূর্ববাঙলার কমিউনিস্টরা প্রাধান্যলাভ করতে সক্ষম হয়নি। সঙ্গতিপূর্ণ বুর্জোয়া কর্মসূচীর রাজনৈতিক কর্মসূচীর কারণে পূর্ববাঙলার বাঙালী বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদীরা উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে বিশেষভাবে প্রাধান্য লাভ করতে সক্ষম হয়।

রাশিয়া ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ভ্রান্ত তত্ত্বগত লাইনটি হলো ভারত ও পাকিস্তান রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন বুর্জোয়া রাষ্ট্র নয়। ভারত ও পাকিস্তানে অংশতঃ পুঁজিবাদ বিকশিত হয়েছে, কিন্তু পুঁজিবাদী সমাজ গড়ে ওঠেনি। এই দুটি দেশে পুঁজিবাদ মূলতঃ স্বাধীন নয়। ভারত ও পাকিস্তানের পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদ কতৃক মূলতঃ নিয়ন্ত্রিত। ভারত ও পাকিস্তানের মেহনতী জনগণের প্রধান সংগ্রাম গণতান্ত্রিক (বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক)।

তত্ত্বগত বিচারে পাকিস্তান (১৯৪৭-১৯৭১) রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন বুর্জোয়া রাষ্ট্র। পাকিস্তানের উৎপাদন ব্যবস্থা পুঁজিবাদী। পূর্ববাঙলায়, পাকিস্তানে শ্রমিকশ্রেণীর মেহনতী জনগণের প্রধান সংগ্রাম সমাজতান্ত্রিক সংগ্রাম। রাশিয়া ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ভ্রান্ত তত্ত্বগত লাইনের কারণে পূর্ববাঙলার কমিউনিস্টরা পাকিস্তানের কমিউনিস্টরা দেশে প্রধানতঃ সমাজতান্ত্রিক সংগ্রামের পরিবর্তে গণতান্ত্রিক সংগ্রাম (বিশেষতঃ পূর্ববাঙলার জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রন অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম) গড়ে তোলার চেষ্টা করে।

পাকিস্তানের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের শ্রেণীচরিত্র ছিল বস্তুতঃ সমাজতান্ত্রিক (সমাজতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক)। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান প্রধানত পুঁজিবাদী শোষণ বিরোধী এবং পাশাপাশি সাম্রাজ্যবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদী শোষণ বিরোধী। পূর্ববাঙলার কমিউনিস্টদের, আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের পশ্চাদপদ তত্ত্বগত অবস্থানের কারণে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের শ্রেণীচরিত্র প্রধানতঃ আনুষ্ঠানিকভাবে গণতান্ত্রিক (বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক) রূপ নেয়।

তত্ত্বগত বিভ্রান্তির কারণে পূর্ববাঙলার কমিউনিস্টরা পাকিস্তান আমলে ও বাঙলাদেশ আমলে প্রধানতঃ সমাজতান্ত্রিক সংগ্রাম গড়ে তোলার চেষ্টা করেনি। ফলে পূর্ববাঙলার কমিউনিস্টরা ঐক্যবদ্ধভাবে ঊনসত্তরের গণঅভু্যত্থানে এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেনি। পঁচিশ মার্চের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পূর্ববাঙলার জনগণের প্রধান সংগ্রাম একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে (গণতান্ত্রিক সংগ্রাম) পূর্ববাঙলার কমিউনিস্টরা গুরম্নত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেনি। পাকিস্তান আমলে আসাদের মৃত্যুর তাৎপর্য যথাযথ উপলব্ধ হয়নি। বাঙলাদেশ আমলেও আসাদের মৃত্যুর তাৎপর্য যথাযথ নির্ণয় হয়নি।

যেহেতু, বাঙলাদেশ (১৯৭১-২০১১) রাজনৈতিভাবে স্বাধীন বুর্জোয়া রাষ্ট্র। বাঙলাদেশের উৎপাদন ব্যবস্থা পুঁজিবাদী এবং সমাজ পুঁজিবাদী সমাজ। সেহেতু সঠিক কর্মসূচীর ভিত্তিতে বাঙলাদেশে চলমান সমাজতান্ত্রিক সংগ্রাম ক্রমশঃ শক্তিশালী হবে। পাশাপাশি বাঙলাদেশে গণতান্ত্রিক সংগ্রাম বিশেষভাবে সংগঠিত হবে। বাঙলাদেশে প্রধানতঃ সমাজতান্ত্রিক সংগ্রামের গুণগত বিকাশের মধ্য দিয়ে হিমালয় পাহাড়ের মত ভারী আসাদের মৃত্যুর তাৎপর্য যথাযথ নির্ণয় হবে।

তারিখঃ ২৪.০১.২০১১
আইউব রেজা চৌধুরী

লিবিয়ার কমিউনিস্টদের করণীয় (দুই)


লিবিয়ার কমিউনিস্টদের করণীয় হলো সঠিক কর্মসূচীর ভিত্তিতে, প্রধানতঃ গাদ্দাফীর নেতৃত্বাধীন স্বৈরাচারী বুর্জোয়া রাষ্ট্র ও সরকার উচ্ছেদ এবং সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠার সশস্ত্র সংগ্রাম ক্রমশঃ সংগঠিত করা। পাশাপাশি লিবিয়ার নির্যাতিত জনগণকে সাহায্যের নামে লিবিয়ার ভেতরে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলির ষড়যন্ত্রমূলক হস্তক্ষেপকে বাস্তবসম্মত যথাসম্ভব প্রতিরোধ করা।

কঠিন সত্য হলো লিবিয়ায় চলমান সশস্ত্র গণঅভ্যুত্থানে বুর্জোয়া-পেটি বুর্জোয়াদের (অধিকতর বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক অধিকার সমর্থক) প্রাধান্য ক্রিয়াশীল। প্রধান শত্রু বিষয়ক তত্ত্বগত বিভ্রান্তির কারণে লিবিয়ার কমিউনিস্টরা দূর্বল ও বিভক্ত। লিবিয়ার চলমান সশস্ত্র গণঅভ্যুত্থানে কমিউনিস্টদের, শ্রমিকশ্রেণীর মেহনতী জনগণের প্রাধান্য ক্রিয়াশীল থাকলে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলি বুর্জোয়া স্বৈরশাসক গাদ্দাফীর সমর্থনে লিবিয়ায় প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ করতো।

কঠিন সত্য হলো, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা যুদ্ধে পূর্ববাঙলার বাঙালী বুর্জোয়া-পেটি বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদীদের প্রাধান্য ক্রিয়াশীল ছিল। প্রধান শত্রু  বিষয়ক তত্ত্বগত বিভ্রান্তির কারণে পূর্ববাঙলার কমিউিনিস্টরা ছিল বিভক্ত ও দূর্বল। বাঙলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধে পূর্ববাঙলার কমিউনিস্টদের শ্রমিকশ্রেণীর মেহনতী জনগণের প্রাধান্য ক্রিয়াশীল থাকলে আধিপত্যবাদী বুর্জোয়া রাষ্ট্র ভারত পূর্ববাঙলার নির্যাতিত জনগণের সমর্থনে প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ করতোনা।

লিবিয়ায় বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাপক মেহনতী জনগণের প্রধান শত্রুর কি পরিবর্তন ঘটেছে? লিবিয়ায় ব্যাপক মেহনতী জনগণর কি এখন বুর্জোয়া স্বৈরশাসক গাদ্দাফীকে নিজেদের প্রধান শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করেনা? লিবিয়ায় বুর্জোয়া স্বৈরশাসকের সমর্থনে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলির প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ এবং লিবিয়ার নির্যাতিত জনগণকে সাহায্যের নামে দেশের বুর্জোয়া স্বৈরশাসক বিরোধী সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলির প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ কি এক কথা?

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা যুদ্ধকাল পূর্ববাঙলার নির্যাতিত জনগণের সাহায্যে ভারতের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের পর পূর্ববাঙলার ব্যাপক মেহনতী জনগণের প্রধান শত্রুর (বুর্জোয়া স্বৈরশাসক ইয়াহিয়া) কি পরিবর্তন ঘটেছিল? পূর্ববাঙলার ব্যাপক মেহনতী জনগণ কি বুর্জোয়া স্বৈরশাসক ইয়াহিয়াকে নিজেদের প্রধান শত্রু  হিসাবে চিহ্নিত করেনি? পূর্ববাঙলায় স্বৈরশাসক ইয়াহিয়ার সমর্থনে ভারতের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ এবং পূর্ববাঙলার নির্যাতিত জনগণকে সাহায্যের নামে ভারতের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ কি এক কথা?

লিবিয়ায় সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি এবং চলমান সশস্ত্র গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ও সমর্থকদের চেতনার মান প্রকাশ করে বুর্জোয়া স্বৈরশাসক গাদ্দাফীই লিবিয়ায় ব্যাপক মেহনতী জনগণের প্রধান শত্রু। একাত্তর সালে পূর্ববাঙলায় সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি এবং মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ও সমর্থকদের চেতনার মান প্রকাশ করেছিল পূর্ববাঙলায় ভারতের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের পরও বুর্জোয়া স্বৈরশাসক ইয়াহিয়াই ছিল পূর্ববাঙলার ব্যাপক মেহনতী জনগণের প্রধান শত্রু।

লিবিয়ার কমিউনিস্টদের করণীয় হলো পুঁজিবাদের উচেছদ ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, স্বৈরাচারী বুর্জোয়া রাষ্ট্র ও সরকার উচ্ছেদ এবং সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ক্রমশঃ সংগঠিত করা। একইসঙ্গে লিবিয়ার নির্যাতিত জনগণকে সাহায্যের নামে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলির প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে বাস্তবসম্মত যথাসম্ভব পদক্ষেপ নেয়া। বিশেষ করে আরব সমাজতান্ত্রিক সংগ্রামের পতাকাকে সমুন্নত রাখা।

তারিখঃ ২৪.০৩.২০১১
আইউব রেজা চৌধুরী